শংকর ব্রহ্ম-র এক-গুচ্ছ (ডজন) কবিতা--
---------------------------------------------
১).
পুরানো সেই দিনের কথা
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
পুরনো সেই দিনের কথা ক'জন রাখে মনে
যখন ছিল ভালবাসা গোপনে নির্জনে,
ছুটতো তখন ফাগুন হাওয়া রিক্ত বনে বনে
পুরনো সেই দিনের কথা ক'জন রাখে মনে?
পুরনো সেই দিনের কথা ভুলতে পারা যায়?
মনের মধ্যে স্বপ্ন সে সব এখনও গান গায়,
হয় তো তা আর কোনকালেই হবে না পুরণ হায়
তবুও তার আবেগ যেন , দুকূল ছাপিয়ে যায়।
পুরনো সব দিনের কথা ভুলতে যারা চায়
তা'রা না হয় ভুলেই থাকুক, আমার কিবা দায়?
সে সব দিন মণিকোঠায় স্মৃতি হয়ে আছে
পুরনো সেই দিনের আবেশ মনের মধ্যে নাচে।
সে সব নিয়ে নাড়াচাড়ায় আজকাল যে কাটে
হয় তো হৃদয় স্মৃতি মেদুর আপনা থেকে ফাটে,
আনন্দে এই জীবনটাকে কাটাতে যদি চাও
ভালবাসার কাঁটার মুকুট মাথায় পরে নাও।
২).
স্বপ্নের ছবি
*********************************
হেঁটে হেঁটে আমি চলে গেছি কত দূরে
ফিরে আসবার কথাও ভাবিনি ঘুরে
যারা পড়ে ছিল তাদেরও ডেকেছি সঙ্গে
এসে ছিল কেউ,কেউ বা মেতেছে রঙ্গে
এ ভাবেই গেছে দিনগুলি সব ফুরিয়ে
এখন হয়তো গিয়েছি কিছুটা বুড়িয়ে
শরীরে ও মনে তবুও ক্লান্তি আসেনি
স্বপ্নের আশা ছাড়িনি স্বপ্নেরা সব ভাসেনি
হেঁটে হেঁটে পথে স্বপ্ন দেখেছি কত
স্বপ্নে জাগবে তারা যারা ছিল আশাহত
স্বপ্নেরা আজও দুমড়ে মুচড়ে যায়নি
যদিও সে'সব সফলতা খুঁজে পায়নি
এখনও স্বপ্ন ভবঘুরে চোখে দেখে
কবি কি সবটা কবিতায় তার লেখে?
ভাবতে ভাবতে সামনে এগোয় কবি
চোখে মুখে তার আঁকা স্বপ্নের মায়াছবি।
৩).
আত্মহারা
----------------------
মন যখন স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে
তখন আর দরকার হয় না কোন কথা বলা,
তার আগে যত কথার কারিগরি
ভালবাসাকে চটকে তিতো করে ফেলা।
তোমার ইচ্ছে যখন আমার ইচ্ছে হয়ে ওঠে
তখন আর কোন আলাদা ইচ্ছে অনিচ্ছাই
থাকে না আমার,
হচ্ছে তো দেখছি তাই,তোমার মুখের কথাই
এখন আমার প্রাণের কথা
তোমার খুশিই আমার খুশি হয়ে গেছে,
তোমার কষ্ট আমার কষ্ট
তোমার আনন্দে আত্মহারা হই আমি,
এরই নাম ভালবাসা বুঝি?
জানি না বুঝি না কিছু, মনে প্রাণে আত্মহারা হই।
৪).
কবির জীবন কাটে
---------------------
একটি কবিতা আমি পেয়ে গেছি
ভোরবেলা,পাখির কূজনে,
একটি কবিতা আমি পেয়ে যাই খররৌদ্রে,
শীতল জলের স্নেহে, দুপুরের রমণীয় স্নানে।
একটি কবিতা আমি খুঁজে ফিরি সন্ধ্যায়
গড়িয়ায়, পিকলুর চায়ের দোকানে,
একটি কবিতা এসে ধরা দেয়
অকস্মাৎ গূঢ় রাতে, মোহময় টানে।
একটি কবিতা ভুলে কাছে চলে আসে
দাগা দিয়ে চিরতরে সরে যাবে বলে,
একটি কবিতা শুধু দূরে গিয়ে
অনায়াসে, ভালবেসে কাছে আসে চলে।
কবির জীবন কাটে কবিতার সাথে,
এইভাবে বিষাদ-সুখে, দিবসে ও রাতে।
৫).
চাওয়া পাওয়া
-----------------------
সবকিছু চাইলেই হাতে পাওয়া যায় না
ভুলে যেতে চাইলেই ভুলে যাওয়া যায় না।
হয়তো আমাকে কেউ মনে প্রাণে চায় না
আমাকে তবু সে কেন মনে ভুলে যায় না?
কবিতাকে ভুলে থেকে কেন দিন যায় না?
ভুলে যেতে চাইলেই ভুলে থাকা যায় না।
হয় তো বা নিরামিষ কেউ ভাল খায় না
তবু সে আমিষ মোটে কেন খেতে চায় না?
আমাকে যে কাছে চায়,সে তো কাছে পায় না?
সবকিছু চাইলেই কাছে পাওয়া যায় না।
৬).
প্রেম নাকি ঘোর
------------------------
কবিতা কবিতা করে কেটে যায় বেলা
দিন মাস বছর বছর,শব্দ নিয়ে খেলা
শব্দের পিছনে ছুটি ছন্দময়
তবু তাতে কাটে না যে ঘোর।
চোখের সামনে ঘোরে
কত পরী সুন্দরী,
দেখি না তাদের
সেই দিকে দিই না নজর।
' চুল পাকে দাড়ি পাকে
বুদ্ধি তবু পাকে না যে তোর,
চারিদিকে ধান্দা এত,
কিছু কর
শুধু তোর
কাটে না যে কবিতার ঘোর।
সামনে জীবন দেখ
বয়ে যায় প্রবাহিত নদীর মতন,
ধূসর মন্থর বেলা নেমে আসে কাছে
ছদ্ম মোহে কাটে যে এখনও তোর
বুকে প্রেম জাগে নাকি মনে থাকে ঘোর?'
৭).
বিষাদ
----------------------
বিষাদ কবে যে ফুরাবে আমার জীবন থেকে?
এবার শীতে কাটবে না বিষাদ,
বিষাদে ও শীতে বুঝি প্রাণখানি যায়
ভাল করে গায়ে টানি , ছেঁড়া কাঁথা-কানি।
এক একটা আস্ত দিন আমাকে ভরে রাখে বিষাদে
তাকে রাত্রি দিয়ে মুড়ে ফেলে আমি কুয়াশায় ঢাকি।
দিনের ঘটনা সব হিম হয়ে জমে থাকে বুকের ভিতরে,
বুকের কপাট খুলে পরদিন আমি
উনুনের ছাই ভেবে দূরে ডাস্টবিনে ফেলে আসি।
কথা ছিল - ছিল ব্যথা,ছিল না যা - আকূলতা ;
সবটাই ছিল যথা প্রতিচ্ছবি-কথকতা।
আবার নতুন করে শুরু হয় দিনে বিষাদের ভয় ,
সত্যিই কি এর- নেই কোন প্রতিকার, নেই ক্ষয়?
৮).
জীবনের গান
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
মৃত্যুই শেষ কথা তারপর কিছু নেই আর
এই কথা বলে এক সেয়ানা পাগল
করে দিয়ে গেল সব হিসাবের গোল
যতদিন বেঁচে আছ পৃথিবী তোমার
তারপরে কিছু স্মৃতি থাকে শুধু
আর কিছু থাকে নাকি তার?
তাই এত জীবনের কথা বলা
কবিতায় গানে বারবার।
বেঁচে থাকে যারা
তারাই তো জীবনের গান গাইতে পারে
শব তা পারে না অবশ্য সে কারও
ধারও ধারে না
জীবনের মতো সে তো বাধ্য নয় কারও
মৃত্যুর পরে শুধু থেকে যায় কিছু স্মৃতি তারও
সব স্মৃতি মনে ধরে রাখা যায় নাতো কারও
কিছু স্মৃতি থাকে জাগরুক
মাঝে মাঝে মনে পড়ে মনে পড়ে বার বারও।
৯).
তুমি না থাকলে
---------------------------
তোমাকে নিয়ে অনেক কথাই লেখা যায়
কিন্তু আমি শুধু একটা কথাই বলব আজ
তুমি না থাকলে বোধহয়
নিজেকে আর চেনা হতো না আমার।
তুমি এলে, আমার বাসনা সব বিলীন হয়ে যায়
কামনার মুহূর্তে যেই দু'হাত তুলে সামনে দাঁড়াও
এক হাতে সুধা পাত্র আর অন্য হাতে বরাভয়
তখন আমার যে কী হয়,বলব কি আর !
আজ মনে হয়, তুমি না থাকলে বোধহয়
আমার জীবন অপূর্ণ থেকে যেতো হায়।
১০).
স্বপ্নরেণু
-----------------------
মুঠো ভর্তি ফুলরেণু, রঙ বেরংয়ের আশা
একদিন ভাষা পাবে ভেবে,
তুলে এনে রাখি গোপনে সিন্দুকে, পরম আদরে
নিন্দুকে বলবে কত কথা,তাও জানি
তবু কাঁথা কানি জড়িয়ে,এস বসি এখানে,
এইবার শীতে,কোথাও যাব না আর।
তুমি গান ধরবে মনে গুনগুন স্বরে,
মৌমাছিরা ছুটে এসে ঘরে আদর করবে,
সব রেণু ঝরে পড়বে তোমার উপরে
এরপর ফিরে যাবে ওরা,
তারপর যে কি হবে, সে কথা কি ভেবেছিলে তবে?
১১).
মহাকাল
--------------------
শুরুও নেই,শেষও নেই
শুধু যাওয়া আসার মাঝখানে,
এক চিলতে রোদ্দুর
তারপর যদ্দুর চোখ যায়
ধূ ধূ মাঠ খাঁ খাঁ করে,
কারও অপেক্ষায়।
পানাপুকুরের পাশে
কালো মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে,
নাকি মেয়েটির পাশে কালো পানাপুকুর
ঠিক বোঝা যাচ্ছে না,
সেই থেকে খোঁজা শুরু
বিভ্রান্তি ঘোচাতে কবি নিজে যায়
মেয়েটির কাছে,
থুরি পানাপুকুরের কাছে
দেখে মেয়েটি কোথায়ও নেই,
পানাপুকুর পড়ে আছে একা।
এ'ভাবেই সব কিছু পড়ে থাকে একা
শুধু জীবনই থাকে না,
মহাকাল হা হা করে হাসে।
১২).
অলীক কল্পনা
---------------------------
উপরে উঠতে চাও, কিন্তু কোথায়?
উপরে শূন্যতা ছাড়া, কিছু নেই আর।
দূরে উড়ে যেতে চাও,কিন্ত কোথায়?
সেখানেও শূন্যতা শুধু ,নেই কিছু আর।
কোথা থেকে, বল তো কে -
পাঠাল তোমায়,এমন জগতে?
অর্থহীন বেঁচে থাকা শূন্যতায়, বন্দীর মতন
মৃত্যও কুহেলিকাময় অনিশ্চিত তেমন।
হতাশায় বন্দী পাখি,শূন্যে তুলে আঁখি
ভাবে, কোনদিন মুক্তি পাব নাকি?
এ'জীবন ধাঁধাঁ যেন এক, শূন্যতায় ভরা
সমাধান নেই কোন তার?
বেদনা আনন্দ ক্ষত সব একাকার,
আমাদের উচ্ছল বাসনা - সুখ,স্বর্গ ও ঈশ্বর জল্পনা
মনেহয় কিছু নয় আর সব শুধু অলীক কল্পনা।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
* প্রাপ্তি স্বীকার করলে, স্বস্তি পাবো।
অভিনন্দন ও শুভ কামনা
ReplyDelete