অলভ্য ঘোষের গুচ্ছ কবিতা--
রূপ
আয়নার রূপ নিবেদিত
প্রতিবিম্বেরা তাতে প্রতি মুহূর্তে প্রতিফলিত।
পারা আছে তার বুকে ;পাগল সে কেউ দেখে না তাকে।
তার দিকে চেয়ে আসলে সকলে খুঁজছে আপনাকে।
বোধিসত্ত্ব
নগ্নতারো একটা বিশেষ সৌন্দর্য থাকলে ভাল লাগে।
নিছক উন্মুক্ততা কৃত্রিম প্রাণহীন
ওর মধ্যে কোনও আবেগ নেই ।
ভালো লাগাও নেই।
যেখানে পবিত্রতার অভাব সৌন্দর্যেরও অভাব সেখানে ।
তৃপ্তিও নেই।ভাগাড়ে বিরিয়ানি খেলে যেমন হয় আরকি।
আবার বাড়িতে ডাল ভাত বেশ সুন্দর বাবু হয়ে বসে
খিদের পেটে অমৃত ।
খিদের সময় পেট পূরনই মূল শর্ত বলতে পারো ;
তবে মানুষের শুধু পেট ভরালেই চলেনা
মনও ভরাতে লাগে।শিশু খাবার গুছিয়ে খেতে পারেনা
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে।তাই মা খাওয়ালেই তার তৃপ্তি।
কিন্তু যত সে পরিণত হবে ততোই সে হবে সভ্য;
সভ্য মানে সুন্দর।যত সুন্দর হবে ততো আসবে তৃপ্তি।
তবে এ সভ্যতা মোটেই সুন্দর নয় ।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাচ্ছে তার ভোগের অন্ন।
তাইতো সুজাতা আজও তথাগত তোমার দ্বারে ভিক্ষুক।
সুন্দরের ভোগান্ন খেয়েই আজোও তার হয় বোধিসত্ত্ব।
দাও দাও সে পায়েস তাকে।
প্রেম অপ্রেম
পৃথিবীতে একমাত্র ভালবাসা হিসেব কষে হয় না।
যা হিসেব কষে হয় তা লেনদেন।
বিশ্বাস দুটোতেই প্রয়োজন হয়।
লেনদেনে বিশ্বাসঘাতকের কোনো ক্ষমা হয়না।
অমৃতের প্রেমিক-তো নিজের হত্যা-কারিকেও
ক্ষমা করে দেয়।
কপালের ঘাম মুছিয়ে দেয় খড়গ হাতে জল্লাদেরো।
কারণ প্রেমে কারও মৃত্যু হয়না।অপ্রেমে সবাই মৃত।
প্রত্ন জিজ্ঞাসা
শুকিয়ে গেলাম ভালবাসা নেই বলে ।
শুকিয়ে যাবে গোলাপি আভার অভাবে
হিরোশিমার মত । ফুসফুস,যকৃত সব
থাকবে উবে যাবে হৃদপিণ্ড !
গ্লেসিয়ারের মত গলে
যাবে বিশ্বায়ন নামক উষ্ণতায় ।
কত হাজার বার নগর ধ্বংস হয়েছে
প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও জানেনা ।
কয়েক হাজার বছর বাদে প্রকৃতির
অলীক নিয়মে সভ্যতার বাঞ্ছিত শর্তে
বিচ্ছিন্নভাবে বঙ্গোপসাগরের তলায়
পাওয়া গেলেও যেতে পারে তোমার
আমার প্রিয় রাস্তা,করিডর,আসবাব কত কি।
হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর মত ।
তখন সাগর টার অন্য নাম হবে ।
তোমার আমার অস্তিত্ব !!!!
পাওয়া যেতে পারে আমাদেরও জীবাশ্ম ।
দুঃখ এগুলো থাকবে অবিন্যস্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ।
এখন কার মত শৃঙ্খলাহীন ভাবেই ।
ওরা সে সময় দাঁড়িয়েও সঠিক অনুমান করে নেবে
আমরা সভ্যতার নামে স্থাপন করেছিলাম পতিতালয়
দেব উদ্যানের মত এই সুন্দর পৃথিবী টাতে ।
অসুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম একে অপরকে
ধ্বংসের ঈর্ষাকাতর খড়গ নিয়ে । পাওয়া যেতে-পারে
অনেক আঘাতের চিহ্ন একটাও গোলাপ ফুল ডায়েরির
পাতার ভেতর ; কাঠখোট্টা শুকনোও পাওয়া যাবেনা ।
বোধোদয়
নৈস্বর্গলোক থেকে নেমে আসা
আমি কোন দেবদূত নই সুজাতা!
রক্ত মাংসের মানুষ।
বোধি বৃক্ষ নিচে এই উপল বেদীর আসনে
ভেব না জয় করেছি সব; কামনা বাসনা,
ক্ষুধা-তৃষ্ণা, রাগ- দ্বেষ - হিংসা মানুষের যতো
জড়তা শরীরে।
ভেবো না আমি সমাধি চাইছি।
মুক্তির পথে সর্বস্ব ত্যাগী। ভিক্ষা পাত্র রেখেছি সাথে।
মানুষের আদিম প্রবৃত্তি গুলো ;
শাসন করে বশ মানাতে চাইছি? -না তাও নয়।
ওভাবে জীর্ণতা বাড়ে।
আমি চাইছি চুম্বন; আমি চাইছি লেহন;
আমি চাইছি মৈথুন চিরন্তন অনন্তের পথে।
ঠিক তোমার ওই সুমিষ্ট সুন্দর পায়েসের মত।
কি যত্নে তুমি শর্করা দুধে গুলে বাসমতী চাউল
দিলে তাতে ঢেলে। উষ্ণতা দিয়েছ যতটা চেয়েছো তুমি।
দ্রাক্ষা ছড়িয়েছ তাও পর্যাপ্ত পরিমিত।
স্বচ্ছ মৃন্ময় পাত্রে সেবা নিতে শেখালে ভোগান্ন।
আমার এই ক্ষুধার্ত শরীরে সত্যের আত্মা গেছে জেগে।
আমার এই বধির কর্ণকুহরে ; মুক্তির বানী আজ বাজে।
আমার ক্ষীন দৃষ্টি পেয়েছে দিশা।
মূক মুখমণ্ডলে অনাবিল অমৃতের তৃষ্ণা।
অগ্নির রুঢ় সত্যে গড়ে নিলে অবিকল্প
সুন্দরে।
বুঝেছি নির্বাণ মানে নিয়ন্ত্রণ তেজস্ক্রিয়তার।
মোক্ষ মানে হেলায় অতিক্রম জরাজীর্ণতা।
মেঘকে-পত্র
প্রিয় মেঘ।
বৃষ্টি চেয়েছিলাম এই খরা দগ্ধ ভূমিতে।
ভালোবাসা চেয়েছিলাম মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে।
শ্বেত শুভ্র মেঘ কুমারী ব্লক করে দিলে!
মেঘের আস্তরণে ঘনীভূত সম্ভ্রম ধুলো কণা যেন ভুলোনা।
বরফের কঠিন বর্মে যেন লক্ষ্মীন্দরের বাসর ঘর।
ক্ষুদ্র ছিদ্রও কি নেই যেখান থেকে আমার অভিশাপ
প্রবেশ করতে পারে তথাকথিত লৌকিকতার
কঠিন দুর্গে ঢাকা তোমার অন্দরে।
ধুলোয় নেমে আসতে তোমায় হবেই বৃষ্টি কণা
আমার উদোম মাঠটার বুকে তোমার ওই মিথ্যে ভেসে থাকা
আকাশ ছেড়ে; কেবল একদিনের জন্যে নয় জন্ম জন্মান্তর
ধরে; বার বার।তুমি গলে যাবে আমার চিতার ভস্মে।
বেহুলার মতো ভেলা ভাসাবে মেঘের আস্তে কুড়ে।
ইতি-
ভুবন ডাঙ্গার মাঠ
ভার্চুয়াল প্রেম
তুমি আমায় পছন্দ কর ?
ক্লিক করে দাও লাইকে ।
উপহার পাঠাতে চাও ?
পাঠিয়ে দাও একগাদা
গোলাপ ফুলের ছবি ।
আমি গন্ধ খুঁজবনা দু চোখ
ভরে শুধু দেখব তোমাকে ।
তুমিও আমাকে দেখতে চাও;
চাও উষ্ণতা নিতে ?
কল কর ভি ডি ও চ্যাট অপশনে ।
তুমি আমায় ভালবাস ?
একটা ছোট্ট ম্যাসেজ করে দাও
আই লাভ ইউ ।
আমি বুঝে যাব তোমার
ভালবাসার গভীরতা ।
কিন্তু প্লিজ রক্ত মাংসের আমাকে
দেখতে চেও না ।
আমার অনেক
কদর্যতা আছে ।
এক তরফা
দেখলে তুমি শুধু আমাকে ওপর
ওপর দেখতে পাও ।
থ্রি ডাইমেনশনে বুঝবে
আমারও অনেক জটিলতা , অজ্ঞতা ,
খামতি আছে ।
তোমার ও কি তাই ?
কি বলছ ; পুরু মেকআপ করা মুখে ;
ধুর পাগল ঘামে আর আকাঙ্ক্ষায়
কোন আস্তরণই থাকে না ঘনিষ্ঠ
মুহূর্তে ।পেঁয়াজের খোলার মত
একটা একটা পাপড়ি ছাড়িয়ে
নিজেদের বুঝে ফেলার পর যদি এ
প্রেমের ঝাঁজ না টেকে ! তার চেয়ে
ভালো তুমি থাকো শুধু একটা ইমেজে
বাঁধানো ছবির ফ্রেমে । হৃদয়ের
অ্যালবামে তোমার পাতা উলটে দেখব ;
যখন ওয়েব লিংক খুঁজে পাব না ।
চোখের জল
তোর চোখের কোনে জল লুকিয়ে আছে।
হাসছিস তুই কান্না লুকিয়ে মেয়ে।
এমন করে রাধাও হেসেছিল
স্বামীর ঘরে কৃষ্ণ কে বুকে নিয়ে।
কান্না জমে বুকের মাঝে প্রেমের ঘন দ্রবণ।
কষ্ট গুলো জমতে জমতে চোখের জলে
একদিন ঘনায় ঘনশ্যামের শ্রাবণ !
বাঁধন
তোমার সাথে খেলবো বলে এসে
নিজেই দেখছি খেলনা হয়ে গেছি।
তোমায় আমি বাঁধবো বলে এসে
নিজেই এখন বাঁধন মেনেছি।।
সুজাতা
আমি তোমার বুক তছনছ করে দিতে চাই।
চাই উন্মাদের মত হাল কর্ষণ করতে ।
তুমি কি কিছুই বোঝ না।
আমি আমার পৌরুষে আপাদমস্তক তোমায় সিক্ত করতে চাই।
আমি চাই অভিষিক্ত হতে অনুভূতির চরম শীর্ষে ।
তুমি কি বোঝ না টসটস করে যে রস গড়িয়ে পড়ছে;
অন্তর্বর্তী কালীন স্ফীতি ঘটাবে।
তোমায় লেহন করে; মর্দন করে; তোমায় মন্থন করে; আমি অমৃত পাই।
নিস্তরঙ্গ তা থেকে তোমাকে এক এক বিন্দু নিংড়ে পৃথিবীর সব সৃজন
তরঙ্গময়।অন্ধকার থেকে তোমাকে প্রজ্বলিত করে নক্ষত্রমন্ডলী আলোকিত।
তুমি রামধনু তোমার সাত রংয়ে পৃথিবীটা রঙীন।
আর এই সাত রংয়ের মিশেলে তৈরি হয় অন্য যে কোন রং।
আমি বাতিওয়ালা তুমি সাঁঝবাতির রূপকথা।
তুমি কি কিছুই বোঝ না।
তুমিই অন্তর্ঘাত ঘটাও শরীরে মনে।
তুমি কি জানো না তুমিই আমার চালিকা শক্তি আমাকে আত্মায়;
আত্মাকে পরমাত্মায় পৌঁছিয়ে দাও।
তুমি কি ভুলে গেছ তুমি তথাগতর সুজাতা।
তুমি ছাড়া বোধিসত্ত্ব লাভ হত না।
তুমি কি ভুলে-গেছো তোমার পায়েস খেয়েই
মাতা মায়াদেবী ও বিমাতা গৌতমী পুত্র সিদ্ধার্থ
গৌতম বুদ্ধ হয়েছে।
তুমি মৃতসঞ্জীবনী।
তুমি জ্ঞানীর মনি ।
পুণ্যাত্মার মৃগনাভি
বা মহাত্মার কস্তূরী।
No comments:
Post a Comment