অভিষেক ঘোষের গুচ্ছ কবিতা --
১
ভালো লাগে
একটা মেয়ে, শরীরের বহু পুরাতন
মচকা ব্যথার মতন চেনা ।
আরামকেদারার একপাশে এলিয়ে দেওয়া
অবসন্ন হাতের মতো, সে,
সাগরপারে একা শুয়ে থাকে ।
আর তার দীঘির মত চোখে
সহসা অবুঝ অভিমান ভর করে ।
তার আলতা-পরা পায়ে, অবুঝ পঙক্তিবদ্ধ
কবিতারা ধুলোবালির মতো লেগে থাকে ।
আমার চোখে চোখ রাখলেই দেখি, ভিতরে
রক্তিম শূন্যতা, যেমন সন্ধ্যায় দিগন্তের কোলে
দিনের ক্রন্দন । ওর বাতাসে ওড়া ইতস্তত চুলে,
প্রশমিত হয় আমার কপালের উত্তাপ -
বড়ো ভালো লাগে ।
২ বর্ষামঙ্গল
নির্বিরোধী শাকাহারী মেঘেদের দল,
নত মুখে আড়াআড়ি ছুঁড়েছিল জল ।
আমি বহু পথ ঘুরি ছপছপ পায়ে,
দেখেছি কাদার দাগ শুকিয়েছে গায়ে ।
আশাতীত সরলতা বর্ষার জলে,
দুঃসময়ের স্মৃতি মুছেছে বাদলে ।
ছাতার কোণায় লেগে জলের কাহন,
দাঁড়িয়ে ভিজেছি তবু জোটেনি বাহন ।
সহসা মাতাল হাওয়া উঠেছিল পথে,
চঞ্চল আঁচল সামলালে কোনোমতে ।
অরাজক বুকখানা বাসনা জাগিয়ে,
নিমেষে উধাও হয় গলিমুখ দিয়ে ।
পলাতকা চেয়েছিলে একবার ফিরে,
মুহূর্ত অক্ষয় হল, দ্যোতনা শরীরে ।
৩ ভালোবাসি
শুধূু একটা শব্দ... 'ভালোবাসি'
উচ্চারণ-মাত্রই মাথা নীচু করে নেয়,
সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল যুবক ।
অনাদরে ক্ষয়ে যেতে বসা হৃদয়ে
অবদমনের শুঁয়াপোকা বদলে যায়
রামধনু-রঙা প্রমত্ত প্রজাপতিতে... ।
আবেশে-আদরে দোল খেয়ে ওঠে সমস্ত
তরুণ তরুর মাথা, সবেগে নত হয় ফুলগুলি,
নিবেদনের মাধুর্য নিয়ে কোলে ঝরে পড়ে ।
বার্ধক্যের বিব্রত, করুণ, কুঞ্চিত চর্মে
জাগে সবুজের উদ্ভাস !
তাই... ভালোবাসতে শেখার মানে,
কচি পাতার সোহাগ প্রাণে...
সহস্র স্নিগ্ধ সুরভি ঘ্রাণে
আর পা ফেলা অসাবধানে !
8 দাওয়া-তে দাওয়াত
পাকা ধানের উপর উজ্জ্বল সূর্য কিরণের মতো,
অপরূপ হাসি । সস্তা প্লাস্টিকের চুড়ি পরা হাতে,
দুটো সদ্য ভাজা পাঁপড় ধরে, হাসি মুখে বলা,
"কই... আর দুটো নাও !"
টাইম টেবিলে দেখেছিলাম, দুটো কুড়িতে ট্রেন ।
এখন ঘড়িতে বাজে, একটা পঞ্চাশ ।
হাত মুখ ধুয়ে প্রস্তুত হতে অন্তত
দশ মিনিট তো লাগবেই । স্টেশনে যেতে
আরো দশমিনিট । তবু এই ট্যালট্যালে ঝোল
আর গরম ভাতের সুবাস, এই কাঁচা লংকা,
আধখানা পেঁয়াজের আন্তরিকতা ছেড়ে,
উঠে যেতে মন চায় না । ট্রেন ছেড়ে গেলে, যাক্ !
আমি আরেকটু বসে যেতে চাই
ধানক্ষেতের শিরোনামহীন মলাটে আঁকা,
এই অপরিচয়ের রহস্যমাখা, পল্লির প্রান্তে,
এই মাটির দাওয়া-র দাওয়াতে ।
৫ নিশ্চিন্তির ঘুম
সব কেমন অভ্যাস হয়ে যায় না ?
ঘাগুলো, আঘাতগুলো, পাষণ্ড অভাবগুলো !
কিছুই আর বিচলিত করে না !
প্রতিবাদ জাগে না পাষাণ বুকে !
বন্ধু হারায় একে একে, স্নিগ্ধ সব সম্পর্কও,
শৈশবের জ্যামিতি বক্সের চাঁদা,
কম্পাস, রবারের মতো ।
এই বহমান পাঁক, এই মোহ, মিথ্যে জাঁক,
দেখে ঘৃণা হয় না ! হয়তো চোখ ফিরিয়ে নেওয়া
সহজ বলেই, নাকি লোভ ? যেটুকু আছে,
পেয়েছি যেটুকু, সেটুকু হারানোর ভয়ও ?
আমাদের ঘিরে থাকে আপাতশান্তির
তুলোর বালিশ, আমরা দেয়ালা-রত শিশুর মতো নিশ্চিন্ত আঙুল চুষি আর ঘুমাই ।
***লেখক পরিচিতি : পেশায় স্কুল শিক্ষক, বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য । গত দশ বছরে আনন্দবাজার পত্রিকা-সহ, বার্তা, পথ, দিগন্ত ইত্যাদি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং দক্ষিণের জানালা, এবং সইকথা, ইচ্ছেকথা ইত্যাদি ওয়েবজিনে প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, চলচ্চিত্র সমালোচনা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে । এছাড়াও 'শব্দের অভিযান' শীর্ষক কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ।
No comments:
Post a Comment